in

ঈদ কার্ডের স্মৃতিকাতরতা

আনোয়ার হোসেন

বৃত্তের সৃষ্টি বিন্দু থেকে। সারা জীবন বিন্দু হয়ে পড়ে থাকা নিশ্চয়ই কারো কাম্য নয়। একটু একটু করে বেড়ে উঠতে চায় সবাই। প্রকৃতির ধরা-বাঁধা নিয়মে এই বেড়ে ওঠার নাম এক অর্থে পরিবর্তন। ‘বদলে যাওয়া’ বলা হলেও বুঝি খুব একটা ভুল হবে না। গত তিন দশকে পৃথিবীর কী না বদলেছে? সেই বদলের বিপরীতে আমাদের অর্জনের পাল্লা অনেক ভারী হয়েছে বটে, তবে কিছু কিছু বিসর্জনের ঘটনাপ্রবাহের বিজ্ঞাপনে নিজের মুখ যেন নিজেই ঢাকছি লজ্জায়।

দুই বছর ধরে খুঁজে চলেছি খোলায় ভাঙা মুড়ির সন্ধান, পাইনি। আগে গ্রাম থেকে আনা হতো সেই মুড়ি শহরে, আজ শহর থেকে মেশিনে ভাঙানো মুড়ি প্যাকেটজাত হয়ে ফিরে চলেছে গ্রামের হাটে। সেই স্বাদের মুড়ি ফুটছে যেন চ্যাপলিনের ‘মডার্ন টাইমস’-এর অত্যাশ্চর্য মেশিনে! ঢেঁকি, মাটির চুলা থেকে শুরু করে পানিফল আর বেতফল এখন স্থান করে নিয়েছে যেন গ্রামীণ কোনো জাদুঘরে। বেতফলের ঝোপঝাড় দা-কোদালের আঘাতে শৌখিন মানুষের বৈঠক কি খাওয়ার ঘরে জায়গা করে নিয়েছে ডাইনিং টেবিলে কিংবা চেয়ারে। এ প্রজন্মের কেউ বেতগাছ বা বেতফল দেখেছে কিনা সন্দেহ। তাদের কারো মনে যদি থাকে কবিতা রচনার হাঁসফাঁস এবং কোন ক্ষণে জীবনানন্দের ‘হায় চিল’ কবিতাটির দিকে দৃষ্টিপাত করে থাকে, হয়তো জানা হবে তখন: ‘তোমার কান্নার সুরে/ বেতের ফলের মত/ তার ম্লান চোখ মনে আসে/’

‘ঈদ কার্ডের স্মৃতিকাতরতা’ লিখতে গিয়ে ‘বেতের ফলের মত’ মন টেনে নিয়ে গেল কালো-মোটা কার্ডের গায়ে সেঁটে রাখা অ্যালবামের পাতায়। এমন অ্যালবামও আজ খুঁজে পাওয়া ভার। ‘পিরিয়ড ফিল্ম’ বা ড্রামার প্রয়োজনে নতুন করে বানিয়ে নিতে হবে এমন অ্যালবাম। পুরনো সব পথ বন্ধপ্রায়। মেঠোপথ বলে আজ আর কিছু নেই। ফসলের মাঠ হয়েছে ইটখোলা। সব মিলিয়ে বলা যেতে পারে, ঔপন্যাসিক সমরেশ বসুর ‘কোথায় পাবো তারে?’ হয়তো এমন একদিন আসবে, চাষার লাঙলের ফলায় মাটি ফুঁড়ে উঠে আসবে কারো হাতে লেখা চিঠিপত্তর, তালপাতার সেপাই, মাটির খেলনাপাতি, সেই সঙ্গে লুপ্ত ঈদ কার্ডের বহর।

রমজান এলেই মনে পড়ে যায় ঈদ কার্ডের কথা। মনে পড়ে যায় বাপ-চাচা প্রতিষ্ঠিত সিগনেট প্রেসের কথা, মনে পড়ে যায় ঈদ কার্ডের বেচা-বিক্রি, সেই সঙ্গে মাতোয়ারা মন ছুটে যায় ঈদের দিনে মুক্তিপ্রাপ্ত নানা সিনেমার কথায়।

ছেলেবেলা থেকেই আঁকাআঁকির সুবাদে আঁকা হতো ঈদ কার্ড। আঁকার বিষয় ছিল ঘুরেফিরে এক। ওপরে লেখা ‘ঈদ মোবারক’ আর তার নিচে দুজনের কোলাকুলি, দূরে দৃশ্যমান মসজিদের ছবি। আঁকা হতো আর্ট কার্ডের ওপর। প্রচুর আর্ট কার্ড প্রেসে ওয়েস্টেজস্বরূপ কাটিং মেশিনের আশপাশে জমা করে রাখা হতো সরু রশি বেঁধে। সেখান থেকে শ’দুয়েক কার্ড আর ছাপার কালি দিয়ে আঁকতাম কার্ডের ছবি। ছাপার কালি বলে শুকাতে সময় লাগত বেশি। শোয়ার ঘরে দুই জানালায় রশি বেঁধে দুই ভাঁজে ভাঁজ করা কার্ড মেলে দিয়ে সিলিং ফ্যান ছেড়ে শুকাতে হতো হাতে বানানো সব কার্ড। প্রসঙ্গত বলে রাখি, অয়েল কালার ও ওয়াটার কালার তুলি আলাদা করে তখনো চেনা হয়ে ওঠেনি আমার। ফলে ওয়াটার কালার তুলি দিয়ে কেরোসিনযোগে ছাপার কালি দিয়ে ছবি আঁকতে গিয়ে ঝামেলা হতো। রঙের সঙ্গে তুলির লোম বেরিয়ে এসে লেগে থাকত কার্ডের গায়ে। তুলতে গেলে ছবি হয়ে পড়ত ছ্যারাব্যারা। মেজাজ যেত বিগড়ে। রাগের মাথায় ছিঁড়ে ফেলতাম সেসব কার্ড। সঙ্গে সঙ্গে শুরু ননস্টপ কান্না। ছোট দুই বোন কুসুম ও সাহানা বড় ভাইয়ের কান্না দেখে খুশিতে ফেটে পড়ত। শুরু হতো মারামারি আর গালাগালি। এসব দেখে অতিষ্ঠ হয়ে মা বাবাকে জানাল একদিন আমার কথা। এর দুদিন পর বাবা প্রেস থেকে সন্ধ্যায় ফিরে এসে আমাকে ডেকে হাতে তুলে দিলেন মলাট পেপারে প্যাকেট করা অনেকগুলো কার্ড। খুলে দেখি আমার হাতে আঁকা কার্ডের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ও নিখুঁত সেসব কার্ড। ভাঁজ করা কার্ডের মাঝখানে দেখি আঠায় আটকানো রেডিও ব্যান্ডের পাতলা কাগজ। এখানেই শেষ নয়, আরেকটি প্যাকেট খুলে দেখি কার্ডের খাম। খুুশিতে আমি তখন দিশেহারাপ্রায়। পরদিন সকালে বিক্রির জন্য দিয়ে এলাম নিউমার্কেটের দক্ষিণ গেটের সঙ্গে লাগানো উজালা বুক স্টলে। প্রতি কার্ডে আট আনা করে পাব বিক্রির পর আমি। দুদিন পর কার্ডের খবর নিতে গিয়ে শুনি, এরই মধ্যে সব কার্ড বিক্রি হয়ে গেছে, আরো শ’খানেক কার্ড তাদের দরকার।

সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলাম প্রেসে বাবার কাছে। খুলে বললাম কার্ড বিক্রির কথা। শুনে বাবা বললেন, ঘরে ফিরে যা, সন্ধ্যার পর নিয়ে আসব আরো শ’দুয়েক কার্ড। আনলেন, কিন্তু এসব কার্ড দেখি একটু অন্য রকম। কার্ডের ছবি ও লেখার শরীর যেন একটু ফোলা ফোলা ও চকচকে। বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, এর নাম ‘এম্বোজ’। ছাপার কালি শুকিয়ে যাওয়ার আগে সুজির মতো এক রকম দানাদার পাউডার কার্ডের গায়ে ছড়িয়ে দিয়ে কার্ডটাকে একটি বিশেষ যত্নে খানিকটা গরম করামাত্রই ছাপাখানার ‘এম্বোজ’ ব্যাপারটা নিমিষে ফুটে ওঠে কার্ডে বা কাগজে। অবশ্য এর জন্য আলাদা একটা খরচ যোগ হতো মূল কাজের সঙ্গে। কারণ পাউডারটা আসত সরাসরি জার্মানি থেকে এবং দামেও চড়া। এম্বোজ করা সে কার্ড উজালা বুক স্টলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিকের মতো হাওয়া। ঈদের বাকি ছিল আর মাত্র চারদিন। নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছার আগে ঈদ নেবে বিদায়। সুতরাং ঘাটতি থাকলেও নতুন করে আবার কার্ড ছাপানো হবে বোকামি। নিজের মাথায় সেই বুদ্ধির উদয় হওয়ার বয়স তখনো আমার হয়ে ওঠেনি। ব্যাপারটা বাবাই আমাকে বুঝিয়েছিলেন। আমার বয়স তখন ১৩ এবং ক্লাস সেভেনের ছাত্র। অর্থাৎ এসব স্মৃতিকাতরতার সাল-তারিখ ছিল ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর। ম্যাট্রিক পাসের আগ পর্যন্ত এভাবে চলছিল আমার ঈদ কার্ডের ব্যবসা। আর সেই ব্যবসার টাকা শেষ হতো একে একে ঈদের দিনে মুক্তিপ্রাপ্ত নানা সিনেমার পেছনে।

১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ঈদ কার্ডের ব্যবসাপাতি থেকে কয়েক বছর মুক্ত থাকলেও সমূলে মন থেকে তাকে কিছুতেই উপড়ে ফেলতে পারিনি। ১৯৭৯ সালে চবির চারুকলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর আবার নতুন করে সেই ব্যবসা শুরু হলো। আবার ব্যবসা শুরু করার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার সেদিনের সুদর্শন বন্ধু মইনুল আলম। শিল্পপ্রেমী ও শিল্পীমনস্ক এ বন্ধুর কথা কোনোদিন ভুলতে পারব না।

এনায়েত বাজার বাটালি রোডের আমাদের বাসা থেকে রহমতগঞ্জ খলিফাপট্টির মইনুলের বাসার দূরত্ব কম করে হলেও আড়াই-তিন কিলোমিটার। পরিচয়ের কিছুদিন পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্তাহিক ছুটি ও নানাবিধ বন্ধের দিনে মইনুলের বাসায় প্রায়ই আসা-যাওয়া হতো। সময় কাটত আমাদের সিনেমা ও কলকাতার বাংলা আধুনিক গানের গুলতানি করে। অনেক সময় দুপুরের খাওয়াদাওয়া, বিকালের নাশতা সেরে বাসায় ফেরা হতো আমার। এমন একদিনে রমজানের প্রায় প্রথমদিকে মইনুলের বাসায় গিয়ে দেখি রশিতে টাঙানো কিছু ওয়াটার কালারে আঁকা ‘ঈদ কার্ড’। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, তার কিছু স্কুল বন্ধুদের ফরমায়েশি ঈদ কার্ড। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঢুকে গেল ক্লাস সেভেন-এইটে পড়া আমার সেসব দিনের জীবনস্মৃতি। মইনুলকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে পরদিন শুরু হয়ে গেল আমাদের নতুন প্রজেক্ট ঈদ কার্ড ব্যবসা। নানা রঙের প্রেসিং ও নানা সাইজের আর্ট কার্ড, সেই সঙ্গে প্রেসের গুদামের কালো রঙের ড্রাম থেকে প্যাকেটভর্তি এম্বোজ পাউডার নিয়ে আমি হাজির মইনুলের বাসায়। মনে আছে, ভারি অদ্ভুত এক কৌশলের ভেতর দিয়ে সম্পূর্ণ হতো একেকটি কার্ডের সমাপ্তি পর্ব। কার্ডের সিংহভাগ দায়িত্বে ছিল মইনুল, আর আমার দায়িত্ব ছিল তার সহকারীরূপে। সংক্ষেপে খুলে বলা যাক সেই কাজের ধরন ও ধারণ।

একটা মোটা কাচের গায়ে তিন রঙের প্রাইমারি কালার—ব্লু, ইয়েলো, ম্যাজেন্টা কাছাকাছি রেখে একটা ছোট রোলার দিয়ে মেশানো হতো প্রথমে রঙ। তারপর ওই রোলার খুশিমতো কার্ডের গায়ে চালিয়ে নানা আকারের ফর্ম তৈরি করে ব্লেটের সাহায্যে আঁকা হতো আলপনা, ফুল, লতাপাতা ও বিবিধ বস্তুর ফর্ম। এবার দায়িত্ব আমার। কার্ডের সারা গায়ে এম্বোজ পাউডার ছড়িয়ে কার্ডটাকে আংটার সাহায্যে পাউরুটির মতো সেঁকা হতো হিটার স্টোভে। তাপের সঙ্গে সঙ্গে কার্ড হয়ে উঠত যেন কোনো রূপবতীর নারীর মুখ। একটা কার্ডের পেছনে সময় যেত ১৫ মিনিটের বেশি। অর্থাৎ চারটি কার্ডের পেছনে সময় লাগত পুরো ১ ঘণ্টা। যেহেতু রমজানের প্রথম সপ্তাহ, দোকানপাট বন্ধ থাকার ফলে মইনুল আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিল তার রুমে চা-নাশতার ব্যবস্থা। ঘণ্টা দুই পরপর পাউরুটির গায়ে একটা সরু চিকন লোহার শলা ঢুকিয়ে হিটারের তাপে টোস্ট বানিয়ে চায়ে চুবিয়ে চুবিয়ে খেতাম দুই বন্ধু। খানিক রেস্ট নিয়ে আবার শুরু হতো আমাদের কাজ। দিনকয়েক পর জমা কার্ড দিয়ে আসতাম নিউমার্কেটের বিভিন্ন বই, স্টেশনারি দোকানে। আমাদের সেই মৌসুমি ব্যবসার লাভ-লোকসানের কোনো হিসাবপত্তর ছিল না। কেন যে এর পেছনে এত সময় ব্যয় করা হতো, তাও দেখিনি খতিয়ে কোনোদিন। স্রেফ মনের আনন্দে মেতে উঠেছিলাম দুই বন্ধু এ কাজে। বুদ্ধিজীবীরা এর নাম রেখেছেন ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’। অবশ্যই যথার্থ সংজ্ঞা। সেদিন অর্থাৎ আজ থেকে ৪০ বছর আগে আমাদের বয়স ছিল ২০-২২ বছরের কাছাকাছি।

দুই বন্ধুর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর দিনে কোন ফাঁকে ঢুকে গেল আমার জীবনে প্রথম প্রেমের জোয়ার। একই বিভাগের জুনিয়র এক শ্যামলা মেয়ের প্রেমে পড়ে আমার তখন প্রায় হাবুডুবু খাওয়ার জোগাড়। কিছুতেই রাজি হয় না ওই মেয়ে আমার প্রেমের আহ্বানে। বাড়ি তার পাবনা। সুচিত্রা সেনের বাড়িও পাবনায় ছিল।

শেষে বাঁধনে জড়াতে না জড়াতেই এসে গেল রমজানের ছুটি। প্রায় এক মাস দেখা হবে না ওর সঙ্গে! এ কি সম্ভব? ক’দিন পর মার্কেটে যাওয়ার নাম করে বাসা থেকে নিউমার্কেটে এসে হাতে ধরিয়ে দিল একটা লম্বা খাম। কী আছে এর ভেতর? সম্ভাষণ? নাকি প্রত্যাখ্যান? বড় আদরে তাকে কিনে দিয়েছিলাম ঈদের উপহারস্বরূপ একটি দামি পারফিউম। তাও আবার ঈদ কার্ড বেচার টাকায়। সেটা পার্সে তড়িৎ গতিতে ভরে নিয়ে ‘আসি’ বলে চলে গেল চোখের আড়ালে। আমি বেচারা দাঁড়িয়ে আছি প্রচুর লোকের কোলাহলে। ইস্! আর্ট ফ্লিমের দৃশ্যই বটে।

প্রিয় পাঠক। এ লেখা শেষ করা যায় এখানেই। কিন্তু লেখার বিষয় তো আর আর্ট ফিল্ম বা সিনেমা নয়, ‘ঈদ কার্ডের স্মৃতিকাতরতা। সুতরাং লেখার ইতি টানা যাক সেই কাতরতার মনঃকষ্ট দিয়ে।&dquote;&dquote;

প্রাণের হরসে ‘আসি’ বলে যাওয়ার পর ঢুকে পড়লাম মার্কেটের টয়লেটে। ভেবেছিলাম এত বড় খাম, না জানি কত বড় চিঠি। খুলে দেখি চিঠি নয়, চিঠির বাচ্চা। অর্থাৎ স্রেফ একটা চিরকুট। লেখা আছে দুটি মাত্র লাইন, ‘কাল সকালের বাসে বাসার সবাই পাবনা যাচ্ছি। ফিরব ছুটির দুদিন পর। নিচে বাড়ির ঠিকানা দেয়া আছে। যদি কিছু লিখতে মন চায়, লিখতে পারো। তবে সাবধান, হূদয়গত যেন কোনো কথা না থাকে। আমার মা-বাবা বড় কড়া স্বভাবের মানুষ। তাদের হাতে পড়লে তবে সব শেষ।’

ব্যস্, এটুকু। ‘ইতি’ বলে যে চিঠির পর একটা কিছু থাকে, বুদ্ধিমতী প্রেয়সী সেটা থেকে ছিল বিরত। আর নিচে লেখা পোস্টাল ঠিকানাটা কেন জানি মনে হলো সত্যি নয়, ভুয়া।

বিরস বদনে ফিরে গেলাম মইনুলের বাসায়। খুলে বললাম সব কথা প্রাণের বন্ধুকে। কিন্তু মইনুল যে বরাবরই হতাশ প্রাণের আলোর দিশারি। ৪০ বছর আগে যেমনটা ছিল, এখনো তা-ই অনেকটা। কার্ড বিক্রির ২০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায় কান্তা সেন্ট কিনে দেয়ার কথা শুনে মইনুল হয়ে ওঠে আরো অনেক বেশি খুশি। এরপর মন খারাপ করে বাসায় বসে ছিলাম দুদিন। এদিকে পুরো বাড়িজুড়ে চলছে ঈদের হইচই ও মাতামাতি। তিনদিনের মাথায় মইনুল বাসায় এসে হাতে ধরিয়ে দিল ১০ বাই ১২ সাইজের একটি কার্ড। খুলে দেখি, ভারি সুন্দর একটা ঈদ কার্ড। এত বড় ঈদ কার্ড জীবনে প্রথম দেখা। নিজের আঁকা ঈদ কার্ড ও নিজের হাতে বানানো খাম। জানতে চাইলাম, কার জন্য এ কার্ড? প্রত্যুত্তরে বলল শুধু, ‘ঝটপট কাপড় পরে নাও। জিপিওতে যেতে হবে। কার্ডটা পোস্ট করতে হবে।’

রিকশাযোগে জিপিও এসে দেখলাম তিন-তিনটি দীর্ঘ লাইন। লাইন দেখে মইনুলকে বললাম, কাকে পাঠাবে এত বড় ঈদ কার্ড?

শেষে ২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে রেজিস্ট্রি ডাকে সেই চিরকুটে লেখা ঠিকানায় পাঠানো হলো ঈদ কার্ড পাবনায়। বাসায় ফেরার পথে মইনুল এবার জানতে চাইল, ‘কি পিন্টু, মন কি এবার শান্ত হলো?’

সেদিন সেই মুহূর্তে মইনুলকে কী বলেছিলাম এখন আর ঠিক মনে নেই। তবে নতুন করে আজ বলতে ইচ্ছা করছে—

আছে কি সত্যি শান্তি কোথাও

শান্তি আছে শুধু অভিধানে,

ভ্রান্তির তরে শান্তি খোঁজা

লাভ কি বলো অপমানে?

হায় আমার ঈদ কার্ড। হায় আমার ভালোবাসা।

সেই ঢাউস আকারের ঈদ কার্ডটা পাঠিয়ে হারিয়ে যেতাম প্রতিদিন কল্পনার রাজ্যে। এত বড় কার্ড পেয়ে আমার পাবনাবাসিনীর কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

একদিন-দুদিন করে দিন কেটে যায়। ফিরে আসে ঈদের দিন। তিনদিন পর ঈদ কেটে যায়, কেটে যায় আরো সাতেক দিন। খবর পাই না মনে, ফিরে কি এল সে পাবনা থেকে এ শহরে? দুদিন পর খুলবে ভার্সিটি, ফিরবে তো, কে জানে?

সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে একদিন বাবা বলল, দেখো তো পিন্টু এটা কী? পাবনা থেকে ফেরত এল প্রেসের ঠিকানায়।

খুলে দেখি, সেই ঈদ কার্ড। কেউ ওই ঠিকানায় রিসিভ করেনি বলে ফিরে এসেছে আবার আমার ঠিকানায়।

এলো খুশির ঈদ

রাত পোহালে ঈদ