in

নিয়োগে নিয়োগকর্তার খামখেয়ালি

মুত্তাকিন হাসান

দীর্ঘদিন ধরেই দেশী বিদেশী প্রতিষ্ঠানে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে কাজ করেছি এবং করছি। অনেক চাকুরীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিভিন্ন পত্রিকা বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশ করেছি। আমি যখন চাকুরীর প্রার্থীদের জন্য চাকুরীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছি প্রার্থীদের মিনিমাম একটা যোগ্যতা প্রকাশ করেছি যাতে করে মোটামুটি সবাই আবেদন করতে পারে। ঊর্ধ্বতনের চাপে হয়তো কোনো কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রাধিকারের কথা লিখতে বাধ্য হয়েছি।

সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে যে পরিমাণ স্নাতকধারী প্রতি বছর বের হয়ে আসছে তাতে চাকুরীর সংকট এমনিতেই তীব্র। প্রায় প্রতিদিনই ফোন আসে- ভাইয়া একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করা যায় কিনা। এ প্রশ্ন শুধু যে ফ্রেশারদের তাই নয়। চাকুরীর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রার্থীর ক্ষেত্রেও অনেক নিয়োগ কর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সুনির্দিষ্ট করে থাকেন। বিষয়টা কতটুকু যৌক্তিক আমার বোধগম্য নয়। চাকুরীর প্রার্থীকে আগে আবেদনের সুযোগ দেয়া উচিৎ। কেউ হয়তো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে এবং ভালো রেজাল্ট করেছে বলে সে যে তার কর্মক্ষেত্রে অবশ্যই ভালো করবে এমনটি নয়। ভালো বিশ্ববিদ্যালয় বা ভালো রেজাল্ট একজনের যোগ্যতার অন্যতম মাপকাঠি কিন্তু  একমাত্র মাপকাঠি নয়।পরীক্ষা যা আসছে মুখস্ত করে তো ইংরেজি গ্রামার, পরীক্ষায় লিখে দাও। পাস ঠেকায় কে। এবার এ প্লাস সনদ নিয়ে ঘুরতে থাকো। অনেক এ প্লাস সনদধারীদের একটি বড় অংশ ভালো করে ইংরেজিতে একটি চিঠি লিখতে পারে না। ই-মেইল করতে পারে না। ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না। অধিকাংশই বিদেশি বায়ারসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সামনে একটি প্রেজেন্টেশন দিতে পারে না। কারণ, শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারিক চর্চা নেই বললেই চলে। আমাদের পরিবার, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ও শিক্ষিত বেকার তৈরির জন্য অনেকাংশে দায়ী। ঠিক একইভাবে অনেক নিয়োগকর্তারা এ প্লাস বা জিপিএ ফাইভ দেখেই নিয়োগে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু চাকুরী প্রার্থীর সাথে সাথে নিয়োগকর্তাদেরও অভিজ্ঞ হতে হবে। আসলে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান মেধা বিকাশের বহিঃপ্রকাশ মাত্র এবং কর্মক্ষেত্রের কর্মী বাছাইয়ের হাতিয়ার। এ একমাত্র হাতিয়ার যখন নিয়োগকর্তার হাতে থাকে তখনই চাকুরী প্রার্থীদের মাঝে বিশেষ করে ফ্রেশারদের মধ্যে চলে চরম হতাশা। একমাত্র ফার্মা কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি পদ ব্যতিত প্রায় প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই ১/২ বছরের চাকুরীর অভিজ্ঞতা চাওয়া হয় তারপর যদি থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার তাহলে ফ্রেশাররা যাবে কোথায়। এদিকে সরকারি চাকুরীর সীমাবদ্ধতা আর দৌড়াত্ব সম্পর্কে আমাদের কারো অজানা নয়।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এক সমীক্ষায় বলেছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে পাশ করা স্নাতকোত্তর তরুণদের মাঝে বেকারত্বের হার ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে এই হার ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে তুলনামূলক বেশী বেতনে চাকুরীতে প্রবেশ করছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা তরুণরা। আমার পেশাগত জীবনে দেখেছি  বেসরকারি অনেক ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে মধ্যম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরা কর্মক্ষেত্রে অনেক ভালো করেছে। অথচ কর্মক্ষেত্রে অনেক তথাকথিত কিছু ঊর্ধ্বতনরা কোনো কর্মকর্তার পারফরমেন্স নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম  বা পরীক্ষার রেজাল্টও মাপকাঠির দণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। একজন ভালো ছাত্র কোনো কারনে পরীক্ষা ভালো দিতে পারেনি। তাই তার পরীক্ষার ফলাফলও ভালো হয়নি। কিন্তু এ কারণে আমরা বলতে পারি না যে সে মেধাবী নয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, ক্লাসের পেছনের বেঞ্চের বা খারাপ ফলাফল করা ছাত্রটা কর্মক্ষেত্রে ভালো করে।   

বিচিত্র শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে চলছে নিয়োগকর্তার বিচিত্র চিন্তা। প্রায় প্রতিটি নিয়োগকর্তা আশা করেন আমার কর্মকর্তারা আইবিএ ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রীধারী। তাদের বেশীরভাগ ভাবে না যাকে তিনি নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন আসলে তার কাজ কি হবে। আমার পেশাগত জীবনে দেখেছি ইংল্যান্ড থেকে ডিগ্রী অর্জন করা ব্যক্তি যিনি ইংরেজীসহ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাজেও অনেক ভালো কিন্তু তাকে দিয়ে করানো হচ্ছে অফিস কর্মকর্তাদের খাবারের মনিটরিং। অথচ তার পদবী এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার- এইচ আর। পদবী অনুযায়ী তার মাসিক বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সে ঠিকই গ্রহণ করছে। আমাদের নিয়োগকর্তাদের মনমানসিকতা  পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত সাধারন চাকুরী প্রার্থীদের কপালে সহজেই সুখ আসবে না। প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সাথে বিশ্বে ব্যবসার পরিচালনার ধরন অনেক উন্নতি আর পরিবর্তন সাধিত হলেও সে তালে আমাদের দেশ  এখনও অনেক পিছিয়ে। দেশের বেশীরভাগ নিয়োগকর্তারা নিয়োগের ক্ষেত্রে নিজেদের খামখেয়ালিপনা প্রকাশ করে। তাদের সিদ্ধান্ততো সিদ্ধান্ত। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ কিছুটা মাছিমারা কেরানীর মতো। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা নামে একটা বিভাগ রাখতে হয় তাই রাখে। বস্তত এর ভূমিকা খুবই নগণ্য।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী

ট্রেনের টিকেট কাটায় নতুন নিয়ম

মারা না যাওয়া পর্যন্ত গুলির নির্দেশ পুশিলকে