in

প্রতিষ্ঠানে নাম সর্বস্ব মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ নয়

মুত্তাকিন হাসান

একজন মানুষের সমাজে স্বার্থকভাবে বসবাস করার জন্য কতগুলো দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রয়োজন হয়। এই গুণাবলিগুলো তার ব্যক্তিগত সম্পদ। এরূপ ব্যক্তিগত সম্পদ সমৃদ্ধ মানুষগুলোই পরবর্তী মানব সম্পদে পরিণত হয়। তাই মানুষ হলো অমূল্য সম্পদ। আধুনিক এ যন্ত্র সভ্যতার যুগেওে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস। যন্ত্র আর মানুষের শক্তির সার্থক সমন্বয়েই সভ্যতার অগ্রগতি সম্ভব। মানব সম্পদ ছাড়া উন্নয়নের অন্যান্য উপাদান অর্থহীন হয়ে পড়ে।

বলা হয়ে থাকে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এখন চলছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। এ বিপ্লবে প্রযুক্তিগত আলোড়ন সর্বত্রই বিরাজ করছে। অনেকের ধারণা কর্মসংস্থানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রচণ্ড প্রভাব পড়বে। কিন্তু কোনো শিল্প বিপ্লবি একদিনে সৃষ্টি হয় না। মানুষের মেধা আর বিরতিহীন প্রচেষ্টার ফলেই অর্জিত হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের কর্ম ক্ষমতার যথাযথ সক্রিয়তাই কোনো সভ্যতাকে নতুন রূপ দান করতে পারে এবং উপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে মানুষ দ্বারা যোত সই অধিক পরিমাণ ক্ষমতা সঞ্চার করা সম্ভব। প্রযুক্তিগত যত উন্নতিই হোক না যন্ত্রের পিছনে মানুষকেই কাজ করতে হয়।

এ কারণেই প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ থাকে। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান কাজ হলো প্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ ও প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরি করা। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য যোগ্য ও দক্ষ কর্মী সংগ্রহ করা, কর্মীদের দক্ষতার উন্নতি করা এবং উপযুক্ত পারিতোষিকের মাধ্যমে তাদেরকে ধরে রাখার ব্যবস্থা করা। প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক অবস্থা ভেদে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাজে ভিন্নতা থাকলেও প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানকে এ সব কার্যাবলী কমবেশি সম্পাদন করতে হয়। বিষয়টি বিংশ শতাব্দীর ফসল হলেও ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের ধারায় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সার্বিক কার্যক্রমের ধারায় সংযোজিত এক নতুন অধ্যায়।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্রুত বিস্তার ঘটছে। বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও এ বিভাগ অত্যাবশ্যক হয়ে পরেছে। নিঃসন্দেহে বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু অনেক মালিক পক্ষ বা প্রধান নির্বাহীদের এই বিভাগের প্রতি অনীহা বা উদাসীনতার কারণে উক্ত বিভাগের কর্মকর্তাগণ তাদের কার্যাবলী সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাবটা দৃশ্যত না হলেও অদৃশ্যভাবে কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নতির উপর পড়ছে। ইংল্যান্ডে কৃষি বিপ্লব ও শিল্প বিপ্লবের পর কাজের কলেবর আর জটিলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে শিল্প কারখানার কাজের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে মৌলিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ধ্যান ধারনা সংযোজিত হয়। সে সময় মৌলিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে কর্মী ব্যবস্থাপনা নামক যে বিষয় উদ্ভব হয় তাই আজ এ বিংশ শতাব্দীর মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা।

বর্তমানে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতা বা পরিধি যে অনেক বিস্তৃত তা অনেক প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তারা বা কর্তা ব্যক্তিরা অবহিত নন। তাই তারা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে তেমন গুরুত্ব দেন না। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সিভি কালেকশন করে নিয়োগপত্র প্রদান এবং বছরান্তে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট এর শিট প্রস্ততসহ মালিক বা অধিকর্তার ফয়ফরমায়াশি কাজের জন্য লিপ্ত রাখেন। কর্মকর্তাদের অনেকে আবার মালিক বা কর্তা ব্যক্তির পরিবারের সার্বিক সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত। চাকুরী টিকিয়ে রাখার নিমিত্তে কর্মকর্তাদেরও কিছু করার থাকে না। কোথা থেকে কি পাশ করেছে বা কত বড় অভিজ্ঞ তার কোনো তোয়াক্কা করে না। তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে মানব সম্পদ বিভাগ সম্পর্কে তুলনামুলকভাবে ইতিবাচক মনমানসিকতা থাকলেও আত্মবিশ্বাসের অভাব, ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বলতা, প্রায়োগিক জ্ঞানের নিম্নগামিতা, প্রশিক্ষণের অভাব ও সৃজনশীল পৃষ্ঠপোষকতাদানের ঘাটতি বা কমতি রয়েছে।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে যারা কাজ করেন তারা মালিক ও কর্মীর মধ্যে এক সেতু বন্ধন সৃষ্টি করেন। তারা মালিকের সুবিধাদি ও অসুবিধাদী যেমন খেয়াল করেন তেমনি কর্মীর সুবিধা ও অসুবিধাদীর প্রতিও লক্ষ্য রাখেন। তারা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি কোনো প্রফিট না আনতে পারলেও তারাও কিন্তু নন ফাইনান্সিয়াল প্রফিট ম্যাকার। কোনো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন বা সাফল্যর অনেকটাই নির্ভর করে দক্ষ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর। মানবসম্পদ পরিচালনার সাথে ব্যবসা দর্শনকে মানানসই করা মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ কারনেই দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ নির্বাহী নেতৃত্বের সাথে কৌশলগত অংশীদার হিসাবে ভূমিকা পালন করেছে এবং ব্যবসায় সে সকল প্রতিষ্ঠানও ভালো করছে বলে আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয়। তাই মালিক বা অধিকর্তাদের প্রতিষ্ঠানে নাম সর্বস্ব মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ না রেখে এ বিভাগকে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ।


লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী

আজ মহান মে দিবস

বিজ্ঞানীদের সতর্ক বার্তা কানে নেয়নি ভারত