in ,

প্রবাসীদের জীবনেও ঈদ আসে, আসে না আনন্দ

সাজেদুল চৌধুরী

এবারের ঈদের চেহারা যে বেশ মলিন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সারা পৃথিবী এখনো গৃহবন্দি। মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। দোকানপাট বন্ধ। কেনাকাটা করা সম্ভব হচ্ছে না।

মানুষ মন ভরে বাজার করবে, প্রাণ খুলে হাঁটবে, নিশ্বাস নেবে, মুক্তভাবে কথা বলবে, গল্প করবে, আড্ডা দেবে। কিন্তু এর কিছুই তারা করতে পারছে না। ধেয়ে আসা মৃত্যুর মিছিলের অস্তিত্ব এখনো দেদীপ্যমান। বোবা কান্নার আহাজারি চারদিকে। এমনই এক শোকগাথা অস্বাভাবিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে উদযাপিত হতে যাচ্ছে ঈদুল ফিতর উৎসব।

নিষ্ঠুর করোনা কেবল প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে না, কেড়ে নিচ্ছে আমাদের আনন্দ, বিনোদন, অবাধে চলাফেরার স্বাধীনতা। বিঘ্ন ঘটাচ্ছে উপাসনালয়ে গিয়ে উপাসনা করার ক্ষেত্রেও। তবে কেবল করোনাকালীনই নয়, করোনাবিহীন আর দশটা ঈদের ক্ষেত্রেও আনন্দের উল্টো পিঠে যে বেদনার দহন লুকিয়ে থাকে তা আমাদের সবারই জানা।

সমাজে বিত্তশালী ব্যক্তিদের জন্য ঈদ আনন্দের সওগাত বয়ে আনলেও দরিদ্র শ্রেণির কাছে তা আসে অনেকটা ধুসর মলিন হয়ে। মুসলিম বিশ্বের অনেক দরিদ্র দেশে এ ভেদাভেদ ঈদের প্রকৃত সার্থকতাকেই যেন ক্ষুণ্ন করে দেয়। জীবন যাদের কাছে অনেকটা দরিদ্র কিশোরীর ছেঁড়া কামিজের মতো, এ বিশাল উৎসবের দিনটিতেও তাদের বিষাদীয় হাসির ভেতর নিজেদের লুকিয়ে রাখা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না! আর যারা প্রবাসে থাকেন তাদের জন্যও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঈদ খুব বেশি সুখকর হয়ে ওঠে না।

প্রবাসে বসবাসরতদের বড় একটা অংশকেই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। বিশেষ এই দিনটিতেও শ্রম বিক্রির তাগাদা তাদের তাড়া করে ফেরে। ফলে সকালে ঈদগাহে যাওয়ার পরিবর্তে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। ভাগ্যক্রমে কেউ বসদের বলেকয়ে দিনটিতে ছুটি জুটিয়ে নিতে পারলেও নামাজ পড়া ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার থাকে না তাদের।

খুব বেশি পরিশ্রান্তরা ঘুমিয়ে পড়েন। কেউ বালিশ চাপা দিয়ে বোবা কান্না কাঁদেন, কেউবা ফোনে মা-বাবা-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে ব্যথাতুর বুকটাকে হালকা করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। আবার উৎসাহী কেউ কেউ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেফিরে আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করেন। চিড়া মুড়ি যেমন ভাতের তৃপ্তি দিতে পারে না, কৃত্রিম এ আনন্দও কখনো প্রকৃত আনন্দের স্বাদ মেটাতে পারে না।

তবে স্ত্রী সন্তানাদি নিয়ে যারা সপরিবারে প্রবাসে বসবাস করছেন, তাদের বেলায় ঈদের আনন্দ কিছুটা আলাদা হলেও প্রকৃতপক্ষে তারাও পরিপূর্ণ সুখ কখনো পান না।

দেশে পরিবার-পরিজন ও পাড়াপ্রতিবেশীদের মিলনে যে মহাআনন্দের স্ফুরণ ঘটে তার বড় অভাব সেখানে। দেশে ঈদের কেনাকাটা বা নতুন জামাকাপড় নেওয়ার মধ্যে যে আনন্দ, তার কিঞ্চিৎ পরিমাণও প্রবাসে বসবাসরত মুসলিম বাঙালি বা তাদের প্রজন্মের মধ্যে বিরাজ করে বলে মনে হয় না।

এ জন্য যে আবহ বা পরিবেশ প্রয়োজন তা মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো ছাড়া অন্য দেশগুলোতে একেবারেই অনুপস্থিত। এর মূল কারণ হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের উৎসবমুখর ওই বিশেষ দিনগুলো এখনো এসব দেশে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করেনি। ফলে ওই দিনগুলো সরকারি ক্যালেন্ডারে জাতীয় ছুটির তালিকায় লিপিবদ্ধ হতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আমার বিশ্বাস, ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যালঘু দেশগুলোতে যারা সপরিবারে বসবাস করছেন, তাদের অনেকেই হয়তোবা নাগরিকত্ব পেয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। তারপরও অন্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসবের দিনের মতো ঈদের দিনে জাতীয় ছুটি (Public Holiday) না থাকায় অনেক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে তাদের কাজে যোগদান করতে হয়। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ ওই দিনগুলোতে সরকারি ছুটির দাবি জানানো এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করি।

একসময় বিশেষ বিশেষ দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশ সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের উৎসবের দিন শুভেচ্ছাবাণী বা বিশেষ বার্তা প্রদান করত না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় অনেক দেশেই মুসলিম কমিউনিটি সম্প্রসারিত হয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে তারা। কাউন্সিলর থেকে শুরু করে মেয়র, এমপি, সিনেটর হিসাবে নিজেরা স্থান করে নিতে সক্ষম হচ্ছে।

তাই অধিকাংশ দেশেই আজকাল মুসলিমদের এ দিনটিতে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরা বাণী দিয়ে থাকেন। আমাদের আয়ারল্যান্ডও এর বাইরে নয়। গত বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিও ভারাতকার এবার এক ভিডিও বার্তায় মুসলিম সম্প্রদায়কে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, যা মুসলিমদের সম্মানিত করেছে বলে আমার বিশ্বাস। এবার পবিত্র রমজানের শুরুতেই আয়ারল্যান্ডের কোনো কোনো স্কুলে রমজানের শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায় যে দেশটিতে দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে, এটাই তার প্রমাণ।

তবে প্রবাসী মুসলিম হৃদয়ে প্রকৃত ঈদের সার্থকতা ফুটিয়ে তুলতে হলে দিনগুলোকে জাতীয় ছুটির আওতাধীন আনার বিকল্প নেই। আর এ দাবি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কমিউনিটির নেতাদেরই সবার আগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করি। এ ক্ষেত্রে যেসব দেশে মুসলিম কমিউনিটি বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, সেসব দেশেই প্রথমে কমিউনিটিপ্রধান কর্তৃক এ দাবি উত্থাপিত হতে পারে।

সেক্ষেত্রে আমরা যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম কমিউনিটির দিকেই সবার আগে নজর দিতে পারি। ওইসব দেশে মুসলিম কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনগুলো নিজেদের কর্মযোগ্যতা ও দক্ষতা বলে অনেক এগিয়ে আছে। এমনকি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাঙালি মুসলিম এমপিও রয়েছেন, যারা চেষ্টা করলে এ ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যেতে পারে অতি সহজেই। ব্রিটেন বা আমেরিকার মতো যে কোনো একটি দেশে এর স্বীকৃতি মিললে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও স্বীকৃতি মিলবে ক্রমান্বয়ে।

অজানা কারণে ফাইনালে নিষিদ্ধ নেইমার!

বাড়ানো হলো ছুটি