in

মৃত্যুতেও অনেকের জীবন শেষ হয় না

মুত্তাকিন হাসান

পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিরই মৃত্যু আছে। সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রত্যেক মানুষই মৃত্যুর মিছিলের নীরব পথের যাত্রী। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সবাইকে সেই যাত্রায় অংশগ্রহণ করতে হয়। কেউ জানে না কার, কোথায়, কিভাবে মৃত্যু হবে। মানুষের মৃত্যুর স্থান ও সময় জানেন শুধু রাব্বুল আলামিন। মৃত্যুকে নিয়ে মানুষ অনেক ভেবেছে; কিন্তু কেউই এ থেকে রেহাই পায়নি। মহান আল্লাহ ব্যতীত মৃত্যুকে ঠেকানো পৃথিবীর কারো সাধ্য নেই।  

নশ্বর এই পৃথিবীতে আমার আপনার কর্মই একমাত্র অবিনশ্বর, যার কখনো মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর পরও  আমাদের কর্মের জন্য কেউ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে আবার কেউ কেউ ঘৃণাভরে স্মরণ করে। মানুষ স্বভাব চরিত্রে কখনোই পরিপূর্ণ শুদ্ধ নয়। মানুষের স্বভাবচরিত্রে যেমন আছে প্রেম-ভালোবাসা, দয়া-মমতা; তেমনি আছে হিংসাবিদ্বেষ, ক্রোধ, লোভ, অহঙ্কার। আর এ কারনেই সৃষ্টিকর্তা আমাদের বিবেক দিয়েছেন। যা দিয়ে সে ন্যায়-অন্যায়ের বাছবিচার করে এবং অন্যায়-অত্যাচার ও জুলুম-নির্যাতন থেকে নিজেকে বিরত রাখে।  এই বিবেকের কারণে মানুষ পশুর থেকে পৃথক সত্তা। বিবেক’ মানুষের এক মূল্যবান সম্পদ। মানুষের মৌলিক মানবীয় প্রাণশক্তিই হলো বিবেক। এটি ছাড়া মানুষ কখনো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে পারে না। সব মানুষই বিবেকসম্পন্ন। কেউ তার নিয়মিত পরিচর্চা করে, কেউ তারে অবজ্ঞা এবং অবহেলা করে। বিবেকের পরিচর্চার মাধ্যমেই কোনো মানুষ প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়। আবার বিবেককে ক্রমাগত অবহেলার মাধ্যমে বিবেকের অপমৃত্যু ঘটে এবং মানুষ অ-মানুষে পরিণত হয়। সমাজ ও সভ্যতায় নেমে আসে অরাজকতা, বিপর্যয়, অন্যায় ও অবিচার। যেই সমাজে মৃত বিবেকের সংখ্যা বাড়তে থাকে সেই সমাজ পশুর খোঁয়াড়ে পরিণত হয়। আর মানুষ যখন নিজের পশুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে সৎভাবে জীবনযাপন করে তখনই সে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ মানুষ হলেই তাকে  ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বলা যায় না।  

‘আশরাফুল মাখলুকাত” হচ্ছে স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। কিন্তু সকল মানুষই কি সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি? এখানে প্রশ্ন রয়ে যায়। কেননা আল্লাহ্‌ আপনাকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন বলে আপনি অনেক আনন্দিত কিন্তু আপনি কি আশরাফুল মাখলুকাত কি না তা ভেবে দেখা উচিৎ। অতএব,”আশরাফুল মাখলুকাত” হতে গেলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবশ্যই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং অবশ্যই সৎকর্ম করতে হবে। বর্তমান যুগের আমরা অনেকেই বিশ্বাস স্থাপন করেছি কিন্তু সৎকর্মের ধার ধার ধারি না। তাদের কখনোই আশরাফুল মাখলুকাত বলা যায় না।

জন্মের ব্যাপারে মানুষের নিজের কোনো ভূমিকা থাকে না। কে কোন পরিবারে জন্ম নিচ্ছে তা তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। কিন্তু  কর্মে তার ভূমিকা ও অবদানের দায় তার নিজের ওপর বর্তায়। পৃথিবীতে মানুষের প্রকৃত বিচারে তাইতো তার জন্ম-পরিচয় তেমন গুরুত্ব বহন করে না। বরং তার কর্মের অবদানের মাধ্যমেই মানুষ পায় মর্যাদার আসন এবং হয় সে বরণীয় স্মরণীয়। আবার অন্য পক্ষে হয় ঘৃণিত।  

এই পার্থিব জীবনে মানুষ ছোট থেকে বড় যে কাজই করুক না কেন পরকালে কর্ম অনুযায়ী তার পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হয়। যত বড় মাপেরই লোক হোক না কেন মৃত্যুর পর তার নিজের দ্বারা সব আয়োজনের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। নিজের জন্য নিজে কিছুই করতে পারে না। তাই মৃত্যুকে স্মরণ করে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করা। এতে নিজের মধ্যে অনুশোচনা পয়দা হবে, যা মানুষের মোহমুক্তি ঘটায়। জীবনের উপকরণ হিসেবে পার্থিব বস্তুসামগ্রীর চাহিদার প্রয়োজন আছে কিন্তু তা বিলাসিতা নয়- ভোগ বিলাসীতে আসক্ত হওয়া অর্থ পার্থিব জগতে মোহগ্রস্ত হওয়া, যা খুবই নিন্দনীয়।    অর্থ-বিত্ত,পদ-পদবী, ভোগ-ফূর্তি এবং ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মোহই তো সকল ব্যাধির মূল,ব্যক্তি ও সমাজের সকল অশান্তির কারণ এবং বিবেকসম্পন্ন মানুষকে করে বিবেকহীন। আর এ ধরণের বিবেকহীন মানুষদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাদের জীবনেরও শেষ হয়।

তবে কারো কারো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবন শেষ হয়ে যায় না। যারা জীবদ্দশায় ভালো কাজ করে থাকে তাদের শারীরিক অনুপস্থিতি থাকলেও তাদের জীবন উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আলোয় আলোকিত করে রাখে এ সমাজ। পরিবার ও সমাজে নিরন্তর ভালোবাসার মধ্যে তারা বেঁচে থাকে। দেহ মাটির চাঁদরে আবৃত থাকলেও তাদের কর্ম, শিক্ষা আর আদর্শ প্রতিটি মানুষের প্রাণে ধ্বনিত হয়। অনেকে স্মৃতিতে এ্যালবাম করে রাখে।  তাই আমি আপনি আজ যে অর্থ বিত্ত নিয়ে বড়াই করছি তার কতটুকু পরবর্তী জীবনের জন্য প্রয়োজন সেটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই ক্ষণিকের খেলাঘরে শুধু খেলেই গেলাম কিন্তু তার ভালো কোনো  ফলাফল  রেখে গেলাম না তাহলে এ খেলায় পরাজিত ছাড়া আর কিছু নয়। সারাজীবন নিজের সুখের নেশায় ছুটে যাবার বেলায় সর্বস্তরের মানুষের জন্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রেখে গেলেন না তাহলে আপনার এ প্রস্থান আপনার চিরতরের প্রস্থান। 

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী   

প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে: কৃষিমন্ত্রী

যে যেভাবে পারছেন ঢাকা ছাড়ছেন