in

সাফল্যের ধারাবাহিকতাই কর্মক্ষেত্রের সফলতা

মুত্তাকিন হাসান

সফলতার সংজ্ঞা একেক মানুষের কাছে একেক রকম। কারো হয়তো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর একটা নির্দিষ্ট সময়ের লক্ষ্য থাকে। সফলতার সংজ্ঞা যার কাছে যেমনি হোক। প্রফেশনাল ক্ষেত্রে এর ধরনটা আমার মনে হয় একটু ভিন্ন। কারোর লক্ষ্য হতো নির্দিষ্ট বিষয়কে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তা আবার কারোর জন্য ধারাবাহিক। যারা ধারাবাহিক সফলতার প্রত্যাশী প্রকৃত তারাই  সফল বলে আমরা সাধারণত মনে করি।

আমেরিকার এক রেডিও স্পীকার এবং লেখক আর্ল নাইটিংগেল বলেন, একটি যথার্থ উত্তরোত্তর উপলব্ধির নামই সফলতা।“উত্তরোত্তর” এই কথার অর্থ হলো সফলতা একটি গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, এটি একটি সফর। আমরা কখনোই গন্তব্যে পৌঁছাই না। একটি লক্ষ্যে পৌঁছার পর আমরা দ্বিতীয়টির দিকে যাত্রা করি এবং সেখান থেকে পরবর্তী লক্ষ্যে যাত্রা করি। “উপলব্ধি” হলো একটি অভিজ্ঞতা। বাইরের কোনো শক্তি আমাদের সাফল্যর অনুভূতি দিতে পারে না, এটা আমাদের নিজের মধ্যে অনুভব করতে হবে।“যথার্থ” শব্দটি ব্যবহার করে বুঝানো হচ্ছে- আমরা ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক কোন দিকে যাচ্ছি?“যথার্থ” কথাটি দ্বারা পদ্ধতির লক্ষ্যের গুণমান নির্ধারিত হচ্ছে। কারন আত্মিক পূর্ণতা ব্যতিত সকল সাফল্যই শূন্য মনে হয়।

কর্মক্ষেত্র হোক আর ব্যক্তিগত হোক জীবনে সফল হওয়ার জন্য অনেক মন্ত্রের বই আমরা বাজারে পাই। আবার অনেকে বড় বড় মন্ত্র সভা সেমিনারে দিয়ে থাকি। এর মধ্যে আমরা অনেকে আছি যারা প্রকৃতি সফল হতে পারি নি বা সফলতা ধরে রাখতে পারি নি।          

কর্মক্ষেত্রে অনেক মানুষ সফল হওয়ার পরেও তার সফলতা বেশীদিন ধরে রাখতে পারে না। একজন সফলতা প্রত্যাশী মানুষকে যেমন তার চারদিকের পরিবেশ- অনুকূল হোক আর প্রতিকূল হোক নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক তেমনি একজন সফল মানুষকেও তার চারদিকের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে চলতে হয়। কারণ কর্ম সফল ব্যক্তিদের শত্রু আরও বেশী। যারা কর্মে ভালো তাদের প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী মহল বেশী। এই মহলের অনেকে সুযোগ খুঁজে কিভাবে তাকে সরানো যায়। আমার নাতিদীর্ঘ চাকুরী জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি দেখতে হয়েছে। এটা শুধু মিড লেভেল নয় টপ লেভেল কর্মকর্তাদের বেলায়ও হয়ে থাকে। কর্মক্ষেত্রের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শত্রুকে উপলব্ধি করা কঠিন। কেবলমাত্র প্রয়োজনের সময় কিংবা বিপদের মুহূর্তে সত্যিকারের শত্রু বা বন্ধু চেনা যায়। ইতিহাসও তাই বলে। তারপরেও মানুষ হিসেবে আমরা একে অপরকে ভালোবাসি, বিশ্বাস করি। বিশেষকরে বাঙালি বড়ই আবেগপ্রবণ মানুষ। ভালোবাসায় যেমন আবেগ আপ্লূত হতে পারে তেমনি শত্রুতার চরম নিষ্ঠুরতার রূপও দেখতে হয়। অদ্ভুদ এক মনস্তাত্ত্বিকদ্বন্দ্ব মানুষের মাঝে বিরাজকরে। তারপরেও মানুষকে ভালোবাসতে হবে। এগিয়ে নিতে হবে কর্মজীবন ও চলার পথ। এক কথায় হতে হবে সফল একজন। সফলতা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নয় এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমরা যে লেভেলের প্রফেশনাল হই না কেন আমাদেরকে শত্রু মিত্র মিলেই ধারাবাহিকভাবে চলতে হবে। চলার পথে যা ক্ষতিকারক তা বর্জন করে অনুকূল পরিস্থিতিকে সমন্বয় করে নিতে হবে। সফলতা ধারাবাহিক বিষয় জেনেও আমরা অনেকেই একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে আটকে যাই। আবার অনেকের ক্ষেত্রে সফলতার একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ব্যর্থতার ম্যানহলে ঢুকে যাই।

জীবনে বা কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়া নিয়ে অনেক লেখা, বই বা প্রবন্ধ আমরা দেখতে পাই। কিন্তু সফলতা ধরে রাখার উপায় বাতিয়েছে এমন লোক খুব কমই পেয়েছি। শুধু সফল হওয়ার উপায় নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই চলবে না। কিভাবে আমাদের এ সফলতা ধরে রাখতে হবে তার উপায়ও খোঁজা দরকার। কারন কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে চরম বাস্তবতা হলো উত্থান আর পতন। একই গতিতে কেউ লক্ষ্যে পৌঁছেছে এমন মানুষ খুব কমই আছে। এর একমাত্র কারন হচ্ছে, আমরা অনেকেই বুঝি না যে কর্মক্ষেত্রের সফলতা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। অথচ এই বাক্যটি আমরা অহরহ শুনে থাকি। নিজের দাম্ভিকতা হোক আর প্রতিকূল পরিবেশ হোক আমরা বেমালুম ভুলে যাই “ধারাবাহিকতা” শব্দটি। আমার পেশাগত জীবনে এমনও দেখেছি ভালো পারফর্মেন্সের জন্য যাকে তিনমাস আগে প্রমোশন দেয়া হয়েছে চতুর্থ মাসে তার চাকুরী নাই। পরবর্তীতে অনেকদিন বেকার থাকার পর অপেক্ষাকৃত নিম্ন মানের কোম্পানিতে কম বেতনে চাকুরী করতে হয়েছে। এখানে তিনমাস আগের অবস্থানের সাথে বর্তমানের অবস্থান তুলনা করলেই বুঝা যায় ধারাবাহিকতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয় যে ব্যক্তি ব্যবস্থাপক হিসেবে একবছর আগে কোম্পানির দামি গাড়ি নিয়ে দম্ভের সাথে ঘুরে বেড়াতো এখন সে বেকার। জীবনের তাগিদে এখন তার সমাজে চলার মতো চাকুরীর প্রয়োজন। আমি কাউকে খাটো করছি না। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ পরিস্থিতির বুঝার বিচক্ষণতার অভাব আর হামবড়া ভাব এমন অবস্থার জন্য অনেকাংশ দায়ী।   

আজ অনেক প্রফেশনাল আছে যারা এখনো অনেক কর্মক্ষম এবং দক্ষ কিন্তু চতুর্দৃষ্টি সম্পন্ন বিচক্ষণ শক্তির অভাবে সফলতার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে। কর্মক্ষেত্রে যারা হামবড়া ভাব নিয়ে ভাবে আমি অনেক জানি কেউ আমার ধারের কাছে নেই, দৃশ্যত তাদের বিপদই বেশী লক্ষ্য করা যায়। আত্ম অহংকার কম বেশী সবার মাঝেই থাকে। কিন্তু যারা প্রকৃতই সফল তারা নিজেকে কখনই বিশেষ মানুষ ভাবে না। এমন অনেক অহংকারী, মেধাবী, কর্মক্ষম এবং দক্ষ প্রফেশনাল দেখেছি যাদের বয়স থাকার পরেও পেশাগত জীবনে নেতিয়ে পরেছে।সফল হওয়ার যেমন শর্ট কাট কোনো  ফর্মুলা নেই, তেমনি সফলতার রাস্তাটাও শর্ট কাট নয়। ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অবলম্বন না করলে সেই সফলতাকে আসলে সফল বলা যায় না।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবসম্পদ পেশাজীবী

পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনে কাজ করছে ভারত-বাংলাদেশ: মোদি

বাংলাদেশ নিয়ে ফেসবুকের বিবৃতি