চট্টগ্রাম নগরের পার্কভিউ হাসপাতাল থেকে মারধর করতে করতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিতে কর্মরত ফয়সাল মাহমুদ ফাহাদ নামে এক যুবককে। তিনি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় সিএমপি’র পাঁচলাইশ থানা পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন— শাহাদাত হোসেন শান্ত, মুহাম্মদ আবুল আহাদ আশরাফুল ও আবু মনসুর মো. তারিক আসিফ। এদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন শান্ত পাচঁলাইশ থানা ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে গুঞ্জন রয়েছে এবং অন্য দুজন আপ-বাংলাদেশ (ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ) এর চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম আহ্বায়ক বলে জানা যায় ।
রবিবার (৯ নভেম্বর) দিনগত রাতে এ ঘটনাটি ঘটে।
জানা গেছে, রাতে পার্কভিউ হাসপাতালের সামনে মাইক্রোবাস স্টান্ড থেকে একটি কালো টিআরএক্স গাড়িতে করে চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরা একটি পরিত্যাক্ত ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই চোখ বেধে চলে রাতভর নির্যাতন।
ফয়সালের সহকর্মীরা অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, ১৩ নভেম্বরের আগে তাকে কোনোভাবেই ছাড়া হবে না। পরবর্তীতে তারা (সহকর্মীরা) পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে একজনকে শনাক্ত করে।
রাতে সহকর্মীরা পুনরায় থানায় গেলে পুলিশ তাদের সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায় এবং তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে ফয়সালের অবস্থান শনাক্ত করে।
ফয়সালের সঙ্গে কথা বলে তার এক ভাই জানান, তাকে তুলে নিয়ে প্রথমে ৫০০ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে নির্যাতনের এক পর্যায়ে ৫ কোটি টাকা চাওয়া হয়। পরিবার এতো টাকা দিতে পারবে না জানালে অপহরণকারীরা ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ চায়।
পরবর্তীতে ফয়সালের বাবা ২ লাখ টাকা দিতে রাজি হন, তবে অপহরণকারীরা আরও ১৫ লাখ টাকা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জানায়, টাকা না পেলে তাকে মেরে ফেলা হবে। শেষে তার বাবা দুই লাখ টাকা দিতে রাজি হন এবং সকালে ফয়সালকে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ উদ্ধার করে।
এর আগে, সকাল ৯টার দিকে ফয়সালের ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের একাউন্ট থেকে রাউজান থানার একটি বুথে গিয়ে ১৮ হাজার টাকা উত্তোলন করানো হয়। পরে সকাল আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে জিইসি মোড়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বুথ থেকে দুই ধাপে মোট ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এছাড়া তার কাছ থেকে নগদ ২০ হাজার টাকাও নেয়া হয়। মুক্তিপণের বাকি টাকা না দেওয়ায় ও অপারগতা দেখানোর পর অপহরণকারীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাকে থানায় সোপর্দ করে।
একটি সূত্র জানায়, পুলিশ এবং রাজনৈতিক চাপে ফয়সাল মাহমুদ ফাহাদকে পাঁচলাইশ থানায় হস্তান্তর করে অপহরণকারীরা। ফয়সালের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকলেও তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর জন্য পুলিশকে চাপ দেওয়া হয়। তবে অপহরণের ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় এবং সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
এই ঘটনায় ফয়সাল মাহমুদ ফাহাদের বাবা মামলা দায়ের করেছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তার ছেলেকে অপহরণ, হত্যাচেষ্টা ও নির্যাতন করা হয়েছে এবং মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে। মামলাটি করা হয়েছে পাঁচলাইশ থানায় (মামলা নম্বর-০৮)। মামলায় মোহাম্মদ আবুল সাজ্জাদ আদর (৩২), মুহাম্মদ আবুল আহাদ আশরাফুল (২৯), আবু মনসুর মো. তারিক আসিফ (২৭), শাহাদাত হোসেন শান্ত (২০), আমিনুল এহসান ফাহিম (২৫) এবং তাদের সহযোগী অজ্ঞাতনামা ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করা হয়।
অপহরণের সাথে জড়িত সন্দেহে পাচঁজনকে আটক করে পুলিশ। পাঁচজনের মধ্যে দুইজনের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাদের আলাদা করে রাখা হয়। এবং তিনজনকে থানা হাজতে রাখা হয়। পরে তাদের পক্ষে পাঁচলাইশ থানা ছাত্রশিবিরের এক নেতা থানায় এসে উচ্চবাক্য করলে তাকেও আটক করে পুলিশ। তবে পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
ফয়সাল মাহমুদ ফাহাদের বাবা মো. জসিম উদ্দিন জানান, ‘আমার ছেলেকে কর্মরত অবস্থায় হাসপাতাল থেকে মারধর করে তুলে নেওয়া হয়েছে। তাকে চোখ বেঁধে রাতভর নির্যাতন করা হয়েছে এবং মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছে। মুক্তিপণ না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে। আমি ছেলের প্রাণ বাঁচাতে ২ লাখ টাকা দিতে রাজি হই। অপহরণকারীরা আমার ছেলের দুটি ব্যাংকের একাউন্ট থেকে মোট ৫৮ হাজার টাকা এবং সাথে থাকা নগদ ২০ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। সারারাত নির্যাতনের পর, মুক্তিপণ না পেয়ে তাকে সকাল ১১টায় থানায় নিয়ে আসে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমি অপহরণ, নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, এটি সত্য। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মাসখানেক আগে তিনি কোনো অপকর্মে জড়িত নন। চার বছর ধরে চট্টগ্রামে ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করছে। সে ছাত্রলীগের পদে আছে—এটাই যদি তার অপরাধ হয়, তবে তাকে থানায় সোপর্দ করা যেত। কিন্তু সেটা না করে তাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হলো এবং সারারাত নির্যাতন করা হলো কেন?। আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই।’
সহকর্মীরা জানান, অপহরণের পর আমারা রাতে থানায় এসে জিডি করি। পুলিশ আমাদের সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায়। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত হয়। তাকে সারারাত নির্যাতন করা হয়েছে। মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছে, টাকাও আদায় করা হয়েছে।
তারা আরও জানান, দুই তিন মিনিটের মধ্যে তুলে নেয়া হয় ফয়সালকে। একটি টিআরএক্স হাইয়েচ গাড়িতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। গাড়ির ড্রাইভারের কাছ থেকে তাকে গহিরা নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
পাচঁলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। এখনই কিছু বলছি না। পরবর্তীতে বিস্তারিত সব জানানো হবে।’
এদিকে ফয়সাল মাহমুদ ফাহাদ বর্তমানে পাঁচলাইশ থানা হেফাজতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানা গেছে।

