বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে ততবারই দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করেছে উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘অতীতের মতো এখনো মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা চলছে। গণতন্ত্রের পক্ষে সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে। এ দেশের মূল শক্তি কৃষক। কৃষক ভাল থাকলে বাংলাদেশ ভাল থাকবে। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে প্রত্যেক কৃষক পাবেন ‘কৃষক কার্ড’। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ঋণসহ নানা সুবিধা পাবেন। কৃষকদের সার্বিকভাবে সহায়তা করে দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। চট্টগ্রাম যদি বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপ নেয়, তাহলে এর সুফল শুধু এই অঞ্চল নয়, সারাদেশের মানুষ ভোগ করবে।
চট্টগ্রাম নগরের পলোগ্রাউন্ড ময়দানে গতকাল ২৫ জানুয়ারি রোববার দুপুরে নির্বাচনী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন- দেশ গড়ার ক্ষেত্রে আমাদের যে পরিকল্পনা রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে দুটি বিষয়ে কঠোর নজর দিতে হবে। মানুষের নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। মানুষের নিরাপত্তায় কঠোর হস্তে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের উন্নয়নে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরতে হবে। আমরা দেশের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য সবসময় অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলাম। বিএনপি সরকার অতীতেও প্রমাণ করেছে। ’৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যে সরকার ছিল, তারা দুর্নীতিতে দেশকে নিচের দিকে নিয়ে গিয়েছিলো। ২০০১ সালে যখন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আপনাদের রায়ে দেশের দায়িত্ব পান, তখন ধীরে ধীরে ধীরে তিনি দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে দেশকে বের করে নিয়ে আসেন। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক তরুণ, যারা কর্মসংস্থান ও নিরাপদ জীবন চায়। দেশ গড়ার আমাদের যে পরিকল্পনাÑ তরুণ প্রজন্মকে সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা চেষ্টা করি দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করতে এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে। আজকে আমি লক্ষ মানুষের সামনে পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই- আমরা যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, সেসব পরিকল্পনার মধ্যে কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা দুর্নীতির মাধ্যমে সেগুলোকে বাধাগ্রস্থ করেন; তাদেরকে কোনো ছাড় আমরা দেব না ইনশাআল্লাহ। গত ১৬ বছর ধরে দেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। তাই ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন হয়েছে পরিবর্তনের জন্য। বাংলাদেশের মানুষ চায় নিরাপদ পরিবেশ, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সন্তানের উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা সুবিধা। ১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে।
তারেক রহমান বলেন, প্রিয় ভাই-বোনেরা, আজ সময় এসেছে পরিবর্তনের। এই পরিবর্তনকে যদি সত্যিকারভাবে মিনিংফুল করতে হয়, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হয়; তাহলে আমাদের সকলকে আজ ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ এখন একটি অর্থবহ পরিবর্তন চায়। দুর্নীতি মোকাবিলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে কোনো পরিকল্পনা কাজে দেবে না। বিগত সময় যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনা করেছেন, আপনারা দেখেছেন যেই হোক না কেনÑ এমনকি আমাদের দলের অনেক লোক যারা কোনো অনৈতিক কাজে নিজেকে জড়িত করেছে; আমরা তাদেরকেও ছাড় দেইনি। আজ এই দেশের জনগণ, এই দেশের মানুষ যদি বিএনপির পাশে থাকে- ইনশাআল্লাহ আগামী দিনেও আমরা একইভাবে কঠোর হস্তে দেশের আইনশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণ করব; যাতে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ নির্বিঘেœ জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
চট্টগ্রামের সঙ্গে গভীর আবেগের সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, চট্টগ্রাম থেকেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আবার এই মাটিতেই তিনি শহীদ হয়েছেন। এই চট্টগ্রামেই খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অনেক সমালোচনা করতে পারি। কিন্তু তাতে কারও পেট ভরবে না, কারও লাভ হবে না। চট্টগ্রামের একটি বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। বিভিন্ন খাল-নালা বন্ধ হওয়ার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। একারণে আমরা খাল কাটতে চাই। চট্টগ্রামে একাধিক ইপিজেড রয়েছে। যেখানে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো বিএনপির আমলে হয়েছিল। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আবার আমাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনেন, তাহলে আরও ইপিজেড করা হবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে সকালে গেলে হবে না উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এবার তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার জন্য উঠতে হবে। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার পর যার যার ভোট কেন্দ্রের সামনে গিয়ে ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করবেন। তারপর লাইন দিয়ে ভোটে দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে যাবেন।
এদিকে সমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা ও আশপাশের উপজেলা থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে পলোগ্রাউন্ড ময়দানে জড়ো হন। সমাবেশস্থল ছাড়িয়ে আশপাশের অনেক এলাকাজুড়ে রাস্তায় নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। ধানের শীষ প্রতীক ও দলীয় পতাকা হাতে লাখো মানুষের স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। জনসমাগম ছড়িয়ে পড়ে টাইগার পাস, কদমতলী, সিআরবি ও আমতল পর্যন্ত। মাঠের ভেতর ও বাইরে মিলিয়ে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ’র সভাপতিত্বে এবং চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানের সঞ্চালনায় মহাসমাবেশে বক্তব্য দেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিনিয়র বিএনপি নেতা সাবেক সিটি মেয়র মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-৬ আসনের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার, বিএনপি’র চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরোয়ার জামাল নিজাম, চট্টগ্রাম-৯ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আবুল হাসেম বক্কর, চট্টগ্রাম-১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমানসহ চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর বিএনপি, যুবদল এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

