নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারীদের ডাকা তৃতীয় দিনের কর্মবিরতিতে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
এর মধ্যেই আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে টানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের নেতারা। পাশাপাশি বন্দর চেয়ারম্যান ও বিডা চেয়ারম্যানের অপসারণও দাবি করেছেন তারা।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বন্দর ভবনের সামনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কর্মসূচির ঘোষণা দেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন। তারা বলেন, তিন দিন ধরে শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বত:স্ফুর্তভাবে কর্মবিরতি পালন করছেন। প্রশাসন তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে উল্টো নিপীড়নমূলকভাবে একের পর এক বদলির আদেশ দিচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, বিডা ও বন্দর চেয়ারম্যান গোপনে দ্রুততার সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের তোড়জোড় চালাচ্ছেন। তারা বলেন, “দেশের স্বার্থবিরোধী এই চুক্তি চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা মেনে নেবেন না। প্রয়োজনে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দর অচল করে দেওয়া হবে।”
এদিকে শ্রমিকদের ডাকা কর্মবিরতির সমর্থনে চট্টগ্রাম বন্দর অভিমুখে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের কালো পতাকা মিছিল আটকে দিয়েছে পুলিশ। সোমবার সকাল ১১টার দিকে আগ্রাবাদ বাদামতল এলাকা থেকে কয়েকশ নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে বন্দরের দিকে যাওয়ার সময় যমুনা ভবনের সামনে পুলিশ মিছিলটি আটকে দেয়। পরে সড়কের ওপর বসে সমাবেশ করে।
সোমবার সকাল ৮টা থেকে তৃতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি চলাকালে বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে পণ্য খালাস নিতে আসা কয়েক হাজার ভারী যানবাহন আটকে পড়ে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, বন্দরে কর্মচারীরা সকালের শিফটে কাজ করছেন না। “আমাদের নিবন্ধিত সাত থেকে আট হাজার শ্রমিক রয়েছে। বুকিং দেওয়ার পরও তারা কাজে যোগ দিচ্ছেন না। ফলে জেটিতে বার্থ করা জাহাজগুলো থেকে সময়মতো পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এতে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে,” বলেন তিনি।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বন্দরের গেটগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, বেসরকারি বার্থ অপারেটরদের শ্রমিকরা কাজ করতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন। কর্মসূচির কারণে আমদানি পণ্যের ডেলিভারি, কনটেইনার ওঠানামা এবং বন্দরের ভেতরে পণ্যবাহী যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। এতে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়। তবে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য খালাসের কাজ স্বাভাবিক রয়েছে।
বারিক বিল্ডিং থেকে সল্টগোলা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বন্দরের গেটগুলো খোলা থাকলেও কোনো গাড়ি ভেতরে ঢুকছে না বা বের হচ্ছে না। নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের অনেককে অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন জানান, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলন চলছে। সিএমপির নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্দর এলাকায় মিছিল বা সমাবেশ করা হয়নি।
টানা তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
তিন নম্বর গেট এলাকায় বন্দর থেকে বের হওয়ার পথে কথা হয় বেসরকারি বার্থ অপারেটরের শ্রমিক আবুল ফজলের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত তিনদিন ধরে আমরা কোনো কাজ করতে পারিনি। আজ সকালে কাজে এসে ফিরে যাচ্ছি। বন্দরের শ্রমিকরা বুকিং নিচ্ছেন না। কোনো লোড আনলোড হচ্ছে না। তাই ফিরে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, বন্দরের নিয়মিত শ্রমিকরা কাজ না করলেও বেতন পান। আমরা বেসরকারি শ্রমিকরা কাজ না করলে বেতন পাই না। বন্দরের শ্রমিকদের আন্দোলনে আমরা বিপাকে পড়েছি।
৩ নং গেটে পান বিক্রেতা আবুল কাশেম বলেন, প্রতিদিন ১৮০০ থেকে দুই হাজার টাকার বিক্রি হয়। বন্দরে শ্রমিকদের আন্দোলন চলায় গত দুইদিন আড়াইশো থেকে সাড়ে তিনশ টাকা বিক্রি করেছি। এখন সংসার চালাতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কারণ আমরা দিনে এনে দিনে খাই।
এর আগে, দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি অপারেশনে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত, ১ ফেব্রুয়ারিও সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন করেন। ঘোষণা অনুযায়ী সোমবারও সকাল ৮টা থেকে কর্মবিরতি করেছেন বন্দর শ্রমিকরা। এতে বন্দর অপারেশনে অচলাবস্থা তৈরি হয়। বন্ধ থাকে পণ্য খালাসও। বন্দর থেকে এ সময়ে পণ্য ছাড় করতে পারেনি আমদানিকারকরা।
এদিকে, আন্দোলনের নামে বন্দরের কার্যক্রমে বিঘœ সৃষ্টিকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ৩ দিনে তিন দফায় আন্দোলনে জড়িত ১৬ কর্মচারীকে ঢাকাসহ চট্টগ্রামের বাইরে বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনায় বদলি করা হয়েছে।

