রবিবার, ৬৫ বৈশাখ ১৪৩২, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ শা'বান ১৪৪৭ হিজরি

প্রচ্ছদঅর্থনীতিসকল সূচকে ইতিহাসে সর্বোচ্চ উচ্চতায় চট্টগ্রাম বন্দর

সকল সূচকে ইতিহাসে সর্বোচ্চ উচ্চতায় চট্টগ্রাম বন্দর

প্রকাশিত :

নিজস্ব প্রতিবেদক

spot_img

একাধিক টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, শুল্ক কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি এবং পরিবহন ধর্মঘটসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ২০২৫ সালে সকল সূচকে ইতিহাসে সর্বোচ্চ উচ্চতায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।

চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশের মোট সাধারণ পণ্য আমদানী-রপ্তানীর প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কন্টেইনার পরিবাহী পণ্যের আমদানী-রপ্তানীর প্রায় ৯৮ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায় ২০২৫ সালে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস কন্টেইনার, ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। এ সময়ে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। উক্ত সময়ে বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউএস কন্টেইনার, ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪০৬-টি জাহাজ বেশী হ্যান্ডলিং হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারী হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর আলোচ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩৪ লক্ষ টিইইউএস এর বেশি। যা চট্টগ্রাম বন্দরের এ যাবতকালের রেকর্ড হ্যান্ডলিং।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিভিন্ন লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কন্দরটি সকল প্রধান সূচকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ সময়ে মোট কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এই পরিসংখ্যানগুলো বন্দরের উন্নত অপারেশনাল সক্ষমতা এবং জাতীয় লজিস্টিক্স চেইন সচল রাখার ক্ষেত্রে এর বলিষ্ঠ অবস্থানের প্রতিফলন।

অপরদিকে চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) কর্তৃক পরিচালিত কন্টেইনার টার্মিনালসমূহে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই হতে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই সময়ে মোট ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬৮ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা বিগত বছরের একই সময়ের (৬ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮ টিইইউএস) তুলনায় প্রায় ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার ৬৪ হাজার ৬২০ টিইইউএস কন্টেইনার বেশি হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। এই ছয় মাসের মধ্যে অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। মূলতঃ মডার্ন কার্গো কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংযোজন, ইয়ার্ড ক্যাপাসিটির সম্প্রসারণ, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিকগণের নিরলস পরিশ্রম ও বিভিন্ন পর্যায়ের বন্দর ব্যবহারকারীগণের অব্যাহত সহযোগিতার কারণে বন্দরের হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

২০২৫ সালে কাস্টমসের কলম বিরতি, বিভিন্ন ধর্মঘট, দেশের পরিবর্তনশীল নাজুক পরিস্থিতিসহ অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাব বন্দরসহ দেশের লজিস্টিক্স খাতে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। এই প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের ওয়েটিং টাইম পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের ৯ দিন, অক্টোবর মাসের ১৮ দিন, নভেম্বর মাসের ২৬ দিন এবং ডিসেম্বর মাসে ২৬ দিন জাহাজের ওয়েটিং টাইম শূণ্য ছিল।

বর্তমানে বন্দরে আগত জাহাজ অন এরাইভাল বার্থ পাচ্ছে। জানুয়ারী হতে নভেম্বর সময়ে জাহাজের গড় টার্ন এরাউন্ড টাইম ছিল ২ দশমিক ৫৩ দিন এবং কন্টেইনার ডুয়েল টাইম ছিল ৯ দশমিক ৪৪ দিন। এতে আমদানী-রপ্তানীকারকরা দ্রুত সময়ের মধ্যে আমদানীকৃত মালামাল ডেলিভারী নিতে পারছে এবং রপ্তানীতব্য মালামাল যথাসময়ে জাহাজীকরণ করতে পারছে। যার সার্বিক প্রভাবে পোর্ট লিড টাইম কমেছে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। বিজিএমইএ এর রপ্তানী আরো গতিশীল হবে। সামগ্রিক রপ্তানীতে গতিশীলতা আরো বৃদ্ধি পাবে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে।

ট্যারিফ বন্দর রাজস্ব:

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। বন্দরের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে জাহাজ সেবা ও মালামাল হ্যান্ডলিং খাত থেকে। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে। অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের প্রণীত ট্যারিফের আওতায় বন্দরের সেবা প্রদান করা হচ্ছিল, যদিও এই সময়ে জ্বালানি, জনবল, যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণসহ পরিচালন ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বন্দরগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং কন্দরের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার সময়োপযোগীভাবে ট্যারিফ হালনাগাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইডিওএম- এর সুপারিশ এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং ১৪ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যকর করা হয়েছে।

উল্লেখ্য চবক এর সাম্প্রতিক সময়ের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বন্দরের ৫ হাজার ৪৬০ দশমিক ১৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে যা গত বছরের একই সময়কালের রাজস্ব আয়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

বেশি এবং উক্ত সময়কালে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ৩ হাজার ১৪২ দশমিক ৬৮ কোটি যা গত বছরের চেয়ে ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশী। একই সাথে সেবার মান অক্ষুন্ন রেখে রাজস্ব আয় আরো বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে রাজস্ব ব্যয় হ্রাস করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। পাশাপাশি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারের রাজস্ব আহরনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে চবক সরকারকে ১ হাজার ৮০৪ দশিক ৪৭ কোটি টাকা প্রদান করেছে। যার মাধ্যমে এটি সরকারের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

আর্থিক উৎকর্ষ অর্জন:

অধিকন্তু, বিগত ৫ অর্থ বছরে জাতীয় কোষাগারে অর্থ প্রদানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সামগ্রিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথম অর্থ বছরে অবদানের পরিমাণ ১ হাজার ৯৫ দশমিক ৫৪ কোটি টাকা থাকলেও পঞ্চম অর্থ বছর শেষে তা ১ হাজার ৮২৯ দশিক ৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। যা সর্বশেষ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। অর্থ আইন ০৪/২০২০-এর অধীনে জমাকৃত অর্থ, মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্স এবং ভূমি উন্নয়ন করসহ গত ৫ বছরে জাতীয় কোষাগারে মোট অবদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৪৯ দশমিক ৫০ কোটি টাকা। এই তথ্যগুলো রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বের একটি স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরে।

এছাড়াও, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)-এর ‘তহবিল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো চৰক আইনের ধারা ৩৫ অনুযায়ী গঠিত তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঝুঁকি হাস, প্রয়োজনীয় তারল্য বজায় রাখা এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা।

এর মাধ্যমে তারল্য বজায় রাখা নিশ্চিত হবে, ফলে বন্দরের পরিচালন ও উন্নয়নের প্রয়োজনে যেকোনো সময় দ্রুত অর্থ উত্তোলন এবং আইনি নিয়ম মেনে বিনিয়োগ করা সহজ হবে।

বন্দরের আধুনিকায়ন ডিজিটালাইজেশন:

চট্টগ্রাম বন্দরে আধুনিক পোর্ট ইকোসিস্টেম, পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম প্রবর্তন, ডিজিটালাইজেশন এবং আধুনিকীকরণের মাধ্যমে একটি বিশ্বমানের বন্দরে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কে পি আই হিসেবে বন্দরের নিরাপত্তা:

বন্দর পরিচালনায় শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বমানে উন্নীত হয়েছে। সম্প্রতি ইউএস কোস্টগার্ড ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট সিকিউরিটি (আইপিএস) দলের দুই দিনব্যাপী

অফিসিয়াল পরিদর্শন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। উক্ত পরিদর্শন শেষে ইউএস কোস্টগার্ড আইপিএস কর্তৃক প্রেরিত অফিসিয়াল পরিদর্শন রিপোর্টে চট্টগ্রাম বন্দরের বিরুদ্ধে কোনো পর্যবেক্ষণ না থাকায় সম্মানজনক জিরো অবজারভেশন পাওয়া যায়, যা চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ও গৌরবময় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়াও, এই পঞ্জিকাবর্ষে আউটার অ্যাঙ্করিজ-এ ৫ টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। যার ফলে বিভিন্ন অপরাধ দমন সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে নতুন ফায়ার এসওপি প্রবর্তন করা হয়েছে। যা অগ্নিকান্ডের পূর্বপ্রস্তুতি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কার্যক্রমে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ নেভি এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছে।

বন্দরের সম্প্রসারণ কার্যক্রম:

চট্টগ্রাম বন্দরে আগত কন্টেইনার এর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ইয়ার্ডের ধারনক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০২৫ সালে ৭০ হাজার বর্গমিটার ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও, বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং ইকুইপমেন্টের পর্যাপ্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উক্ত পঞ্জিকাবর্ষে রাজস্ব বাজেটের আওতায় ৩৫ টি ইকুইপমেন্ট সংগৃহীত হয়েছে যার মাঝে ৩ টন ফর্কলিফট-২০টি, ৫ টন ফর্কলিফট-১৫টি।

চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোগত ও অপারেশনাল কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ টি এডিপিভুক্ত প্রকল্প চলমান রয়েছে যার সাঝে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প হিসাবে জাইকা’র সহযোগীতায় মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পটি অন্যতম। প্রকল্পটিকে গভীর সমুদ্র বন্দর এবং রিজিউনাল ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসাবে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলাধীন ধলঘাটা মৌজায় ২৮৩ দশমিক ২৭ একর জমি ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক- এর কার্যালয় হতে দখল-হস্তান্তর ও ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে তিনটি প্যাকেজ: বন্দর নির্মানের জন্য পূর্ত কাজ (১), কার্গো-হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ (২এ) ও পোর্ট বোট সংগ্রহ (২বি)। তন্মধ্যে প্যাকেজ (১) ও (২এ) এর যথাক্রমে মিৎসুই জাপান পিটিজেভি জাপান-এর সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অপর প্যাকেজ (২বি)টির দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ঠিকাদার কর্তৃক খনন কাজের (ড্রেজিং) প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম (মবিলাইজেশন) চলমান রয়েছে।

একই সাথে বন্দরের কার্গো ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড এবং টার্মিনালের প্রয়োজনীয় ইক্যুইমেন্ট সংগ্রহ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় মোট ৮১টি এর মাঝে ৮০ টি ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ১ টি সহসা শিপমেন্ট হবে। উল্লেখ্য ২০২৫ সালে ৩৩টি ইক্যুইপমেন্ট সংগৃহীত হয়েছে যার মাঝে ফোর হাই স্ট্যাডেল ক্যারিয়ার ১৫টি, ২০ টন মোবাইল ক্রেন-১২টি, লগ হ্যান্ডলার/স্টেকার-২টি, হেভী ট্রাক্টর/পাওয়ার-২টি, লো বেড ট্রেইলার-২টি। চ্যানেলের নাব্যতা উন্নয়ন ও নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট

হতে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত বর্জ্য অপসারণ ও ড্রেজিং প্রকল্প সফলভাবে জুন, ২০২৫-এ সমাপ্ত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৪৮ লক্ষ ঘনমিটার ক্যাপিটাল ও ১৩ দশমিক ১৬ লক্ষ ঘনমিটার সংরক্ষণ ড্রেজিং সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে বিগত বছরে কর্ণফুলী চ্যানেলে সর্বমোট ৫ হাজার ৪৮১টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়েছে।

এছাড়া, বন্দরে ভারী কার্গো হ্যান্ডেলিং এর জন্য লালদিয়া (ব্লক-এ, উত্তর) এলাকায় একটি হেডী লিফট কার্গো জোট নির্মাণ প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার জন্য অর্পিত ক্রয় কাজ হিসেবে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীকে প্রদান করা হয়েছে। এলক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর সাথে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি এমওইউ গত ১০ সেপ্টম্বর তারিখে স্বাক্ষরিত হয়।

স্ট্রাটেজিক মাস্টার প্ল্যানের আলোকে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নগরীর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে বে-টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ টার্মিনালে একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল ও দুইটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হবে, যার মধ্যে একটি পিপিপি জিটুজি পদ্ধতিতে পিএসএ (সিঙ্গাপুর) এবং অপরটি ডিপি ওয়ার্ল্ড (দুবাই) কর্তৃক পরিচালিত হবে।

ইতোমধ্যে বে-টার্মিনালের ব্রেকওয়াটার ও এক্সেস চ্যানেল ড্রেজিংয়ের জন্য “বে-টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প” একনেক কর্তৃক গত ২০ এপ্রিল তারিখে অনুমোদিত হয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ১৩ হাজার ৫২৫ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং খুব শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পুরো বে-টার্মিনাল এলাকাকে একটি আধুনিক ও সমন্বিত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং এটি দেশের প্রথম ‘গ্রিন পোর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।

এছাড়াও বে-টার্মিনালের গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ বিবেচনায় ২১ আগস্ট তারিখে অতিরিক্ত ১৮৮ দশমিক ৪৫ একর জমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বরাদ্দের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা:

একটি দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি ঐ দেশের দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা। আধুনিক বিশ্বে দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি অংশীদারিত্বের বিষয়টি একটি দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন ও চ্যালেঞ্জ। এরই ধারাবাহিকতায়, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনালের নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য গত ১৭ নভেম্বর তারিখে ডেনমার্কের টার্মিনাল অপারেটর এপিএম টার্মিনালস বিভি- এর সাথে ৩৩ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। টার্মিনালটি ২০২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে অপারেশনে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়াও, গত ১৭ নভেম্বর লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল চুক্তির পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক বিদেশী অপারেটর মেডলগ বাংলাদেশ এর সাথে ২২ বছরের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে পানগাঁও আইসিটির আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবার পাশাপাশি এর সক্ষমতা ও ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে।

সামাজিক দায়বদ্ধতা:

চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরীসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করায় চট্টগ্রাম বন্দরে কোন শ্রম অসন্তোষ নেই। মানবসম্পদ উন্নয়নে ২০২৫ সালের পঞ্জিকাবর্ষানুসারে ১৭৫ টি শূন্য পদের বিপরীতে জনবল নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে এবং সেই সাথে ১ হাজার ৭২ জন বিদ্যমান কর্মচারী পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন যা বন্দরের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন: শিশুদের বিকাশে বন্দরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ইতোমধ্যে ৪ টি পার্ক স্থাপন ও কর্মচারীদের অন্যান্য অবসর সুবিধাদি বৃদ্ধির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া, বন্দরের কর্মীদের আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ২০২৫ সালে ৫৪ ইউনিট আবাসিক ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়েছে। একই বছরে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকাসহ বন্দরের প্রায় ৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে আল হিদায়াহ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সাথে একটি ১০ বছরের লিজ চুক্তি করেছে। বন্দরের একটি আধুনিক ভবন মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে স্কুলকে প্রদান করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ২০২৫ সালটি ছিল শুধু অগ্রগতিরই নয়, বরং এক রূপান্তরের বছর। কাস্টমসের কলম বিরতিসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও এ সময়ে বন্দরের স্থিতিস্থাপকতা, আধুনিকায়ন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব আরো সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সেই সাথে প্রধান উপদেষ্টার দিক-নির্দেশনায়, মাননীয় নৌপরিবহন উপদেষ্টার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সমন্বয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের সমুদ্র পথে বহিঃবাণিজ্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনের প্রত্যাশা কেবল প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করাই নয়, বরং একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উদ্ভাবননির্ভর সামুদ্রিক অর্থনীতি নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আমরা একটি বিশ্বমানের বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত করায় ভূমিকা রাখতে বন্ধ পরিকর।

Latest articles

তৃতীয় দিনের কর্মবিরতিতে অচল চট্টগ্রাম বন্দর, মঙ্গলবার থেকে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতির ঘোষণা

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারীদের ডাকা তৃতীয়...

চট্টগ্রাম বন্দর অচলাবস্থা: ক্ষতি নিরূপন দায়ীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি

ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ বন্ধ থাকার...

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া চটগ্রাম বন্দরের ৪ কর্মচারীকে বদলি

চট্টগ্রাম বন্দরের চার কর্মচারীকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে (আইসিটি) বদলি করা...

কর্মবিরতির দ্বিতীয় দিনেও চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা, সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডাকা কর্মবিরতির...

আরও পড়ুন

তৃতীয় দিনের কর্মবিরতিতে অচল চট্টগ্রাম বন্দর, মঙ্গলবার থেকে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতির ঘোষণা

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারীদের ডাকা তৃতীয়...

চট্টগ্রাম বন্দর অচলাবস্থা: ক্ষতি নিরূপন দায়ীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি

ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ বন্ধ থাকার...

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া চটগ্রাম বন্দরের ৪ কর্মচারীকে বদলি

চট্টগ্রাম বন্দরের চার কর্মচারীকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে (আইসিটি) বদলি করা...